November 5, 2026, 2:44 pm

মাসে ২০-২২টি বুকিং থাকত অতিরিক্ত ডিআইজির সেই ফ্ল্যাটে, অতিষ্ঠ ছিল অন্য পুলিশ পরিবার

Reporter Name

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় পুলিশ অফিসার হাউজিং সোসাইটিতে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) আব্দুল্লাহ আল জহিরের ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাটে নিয়মিত ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। উচ্চশব্দে গান-বাজনা, নাচ ও মাদক সেবনের এসব আয়োজনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন হাউজিংয়ে বসবাসকারী অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, প্রায় এক বছর ধরে মাসে ২০ থেকে ২২ দিনই চলত এসব পার্টি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও অভিযোগ করেছিলেন তাঁরা।

গত সোমবার রাতে ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) জানিয়েছে, অভিযানে মদ, ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ গাঁজাসদৃশ মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।

অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের দাবি, এসব পার্টিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদেরও যাতায়াত ছিল। তাঁদের কয়েকজনকে তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেছেন এক কর্মকর্তা।

বুধবার ( ২১ অক্টোবর ) মিন্টো রোডে নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অভিযানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির। তিনি বলেন, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানের আগে তাঁর কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। পরে তাঁকে অভিযানে যুক্ত করা হয়।

ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে ইলিয়াস কবির বলেন, হাউজিং সোসাইটির ভেতরে একটি মসজিদের আশপাশ থেকেও উচ্চ শব্দে গান শোনা যাচ্ছিল। সেখানে প্রায় ২২টি গাড়ি ছিল। অভিযানের সময় ২৬ জন তরুণীসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ব্যাংকারদের পাওয়া যায়।

ডিসির ভাষ্য, পার্টিতে সিসা সেবন, উচ্চ শব্দে গান ও অশালীন নাচ চলছিল। পুলিশ প্রবেশের পর উপস্থিত ব্যক্তিরা দৌড়ে ওপরের তলায় চলে যান। ভবনটির কয়েকটি কক্ষে নারী-পুরুষকে একসঙ্গে পাওয়া যায়।

হাউজিংয়ে বসবাসকারী অন্য পুলিশ কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে এসব আয়োজনে বিরক্ত ছিলেন বলে অভিযানে থাকা একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, পার্টির উচ্চ শব্দে আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতো। এমনকি মসজিদ পর্যন্ত গান-বাজনার শব্দ শোনা যেত। এ নিয়ে তাঁরা পুলিশের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে অভিযোগও করেছিলেন।

এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এসব পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন করা হতো বলে জানিয়েছেন ডিসি ইলিয়াস কবির। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির মূল হোস্ট ছিলেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এবং কো-হোস্ট ছিলেন মাহবুবুল আলম।

মাহবুবুল আলমকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে ইলিয়াস কবির বলেন, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন হয়ে আসছিল। প্রতি মাসে ২০ থেকে ২২টি পার্টি হতো বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থের হিসাব তুলে ধরে ডিসি বলেন, ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়া হতো বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও প্রায় ৯০ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়ার হিসাবও তিনি তুলে ধরেন। তবে এই হিসাবের ভিত্তিতে মাসে মোট কত টাকা আয় হতো, কারা সেই অর্থ পেতেন এবং বাড়ির মালিকের সঙ্গে অর্থের লেনদেন কীভাবে হতো, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাননি তিনি।

অভিযানে উদ্ধার করা সামগ্রীর তালিকায় এক লিটারের একটি পূর্ণ আইকোনিক হোয়াইট হুইস্কির বোতল, এক লিটারের রয়্যাল স্ট্যাগের বোতলে আনুমানিক ৫০০ মিলিলিটার এবং এক লিটারের স্মিরনফ ভদকার বোতলে আনুমানিক ২০০ মিলিলিটার মদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫০ মিলিলিটারের কেরুজ ইম্পেরিয়াল হুইস্কির একটি খালি বোতল উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের তালিকায় একটি ইয়াবা, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও অল্প পরিমাণ গাঁজাসদৃশ পদার্থের কথাও রয়েছে। অভিযানে কনডম উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন ডিসি ইলিয়াস কবির। অন্যদিকে অভিযানে মদ, সিনথেটিক মাদক, সিসা ও বিয়ার উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে ডিবি।

অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৭ জন তরুণকে এক মাসের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ২৬ জন তরুণীকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিসি ইলিয়াস কবির। তাঁর ভাষ্য, আটক ব্যক্তিরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাঁদের অভিভাবকদের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তবে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা নিয়ে বক্তব্যে অসংগতি রয়েছে। পুলিশ প্রথমে ৮৫ জনকে আটকের কথা জানিয়েছে। পরে ৫৭ জন তরুণ ও ২৬ জন তরুণীকে সাজা দেওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে, যাঁদের মোট সংখ্যা ৮৩। অন্য দুজনের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি তাঁর। এ ছাড়া চট্টগ্রামে কর্মরত সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পদমর্যাদার একজন সদস্যও সেখানে ছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেনাবাহিনী নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

অভিযানের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডিসি ইলিয়াস কবির বলেন, জহিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনায় মামলা হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মূল হোস্ট হিসেবে নিজের নাম থাকা এবং পার্টি থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির বলেন, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নিয়ম অনুযায়ী বাড়ির মালিক মূল হোস্ট এটি ঠিক। তবে তিনি নিজে এসব আয়োজন করেন না। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

জহির বলেন, তাকে বলা হয়েছিল, যত নিয়মকানুন আছে, সেগুলো মানতে হবে। কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে যেন সঙ্গে সঙ্গে আমাকে জানানো হয়। প্রয়োজনে অনুষ্ঠান বাতিল করারও নির্দেশ ছিল। তার ভাষ্য, ‘এখন দেখছি, মাহবুব আমাকে অনেক কিছুই জানাত না।’

পার্টি থেকে আয়ের ৭০ শতাংশ পাওয়ার বিষয়ে জহির বলেন, ওই অর্থ তাঁর ভাড়ার টাকা। অবশিষ্ট অর্থ নির্দিষ্ট পরিমাণে মাহবুবুল আলম পান। এ ছাড়া হাউসকিপিংয়ের কর্মী ও মালি অর্থ পেয়ে থাকেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এদিকে বাড়িটির মালিক হিসেবে জহিরের নাম প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এক আদেশে তাঁকে ক্লোজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা বলেন, ডিবি বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে জহিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা