November 5, 2026, 2:22 pm

যুক্তরাষ্ট্রে কোরআনের আয়াতে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেভাবে বাসভর্তি শিশুদের প্রাণ বাঁচালেন যুবক

Reporter Name

যুক্তরাষ্ট্র মিনেসোটার রাস্তায় চালক শারীরিক সমস্যায় (মেডিকেল এমার্জেন্সি) আক্রান্ত হওয়ার পর আতঙ্কিত শিশুদের নিয়ে একটি স্কুল বাস বিপজ্জনকভাবে রাস্তার বাইরে চলে যাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে এক যুবক লাফিয়ে বাসে উঠে ম্যানুয়ালি বাসটি থামান। তিনি জানান, পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতই তাঁকে এই কাজে অনুপ্রাণিত করেছে, যেখানে বলা হয়েছে—একটি জীবন রক্ষা করা মানে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭ বছর বয়সী ইব্রো আহমেদ স্থানীয় সময় গত শুক্রবার মিনেসোটার সেন্ট পলে তাঁদের পারিবারিক কনভেনিয়েন্স স্টোরের সামনে বসে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি সংখ্যার হিসাব করা মানুষ, আর এই সংখ্যাটা আমার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। আমি এটা নিজের জন্য করিনি। ঈশ্বরের নামে এটা ছিল এক নিঃস্বার্থ কাজ।’

দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরায় (সিসিটিভি ফুটেজ) ধরা পড়া এক নাটকীয় দৃশ্যে দেখা যায়—গত সোমবার বিকেলে আহমেদ তাঁদের পারিবারিক ‘ইয়া ব্রিকস স্ন্যাকস অ্যান্ড টোব্যাকো’ স্টোরের বাইরে বিরতির সময় একটি ফুটবল নিয়ে খেলছিলেন এবং মোবাইল স্ক্রোল করছিলেন। ঠিক সেই সময় উন্মুক্ত দরজাসহ একটি হলুদ স্কুল বাসকে তাঁর সামনে দিয়ে চলে যেতে দেখেন।

ইব্রো আহমেদ জানান, বাসচালকের মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে মারাত্মক কোনো সমস্যা হয়েছে (যা মৃগী রোগ বা সিজারের লক্ষণ হতে পারে)। পরিস্থিতি দেখেই তিনি সহজাতভাবেই দৌড়ে বাসের দিকে যান, লাফ দিয়ে দরজার ভেতরে ঢোকেন এবং নিজের দুই হাত খালি করতে ফোন ও চশমা সামনে থাকা দুটো মেয়ের দিকে ছুঁড়ে মারেন।

প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন কোনোভাবে বাসটি ‘পার্ক’ গিয়ারে দেবেন। কিন্তু চারপাশে আতঙ্কিত ছেলেমেয়েদের চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে আহমেদ বাসের এমার্জেন্সি ব্রেক টেনে ধরেন। ফলে বাসে থাকা যাত্রী কিংবা রাস্তার কেউ হতাহত না হয়েই গাড়িটি থেমে যায়। বাস থামানোর পর তিনি শিশুদের একজনকে জরুরি সহায়তার জন্য ফোন করতে বলেন।

সেন্ট পলের পাবলিক স্কুল ডিস্ট্রিক্ট থেকে শুক্রবার এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, সেদিন আহমেদের পরিবারের দোকানের বাইরে বাসে একটি মেডিকেল এমার্জেন্সির ঘটনা ঘটেছিল, যেখানে প্যারামেডিকদের ঘটনাস্থলে আসতে হয়। ডিস্ট্রিক্ট জানায়, বাসে থাকা ১৯ জন শিক্ষার্থীকে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দিতে পরবর্তী সময়ে অন্য আরেকটি বাস পাঠানো হয়। এদিকে চালককে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তিনি এখন বাড়িতে বিশ্রামে আছেন।

ন্যাশনাল সেফটি কাউন্সিলের হিসাব অনুযায়ী, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩ লাখ শিশু স্কুল বাসে যাতায়াত করে—সংখ্যাটি এতই বড় যে মাঝে মাঝে চালকসংক্রান্ত জরুরি ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

তবে এ ধরনের এমার্জেন্সি ঘটলে উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া পথচারীরা প্রায়ই বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে সাহায্য করতে পারেন।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যম কেটিএসপি আহমেদের চলন্ত বাসে দৌড়ে ওঠার ফুটেজটি জোগাড় করে প্রকাশ করে। সেই ভিডিওটি আহমেদের সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে (ভাইরাল হয়)। সাক্ষাৎকারে আহমেদ জানান, ‘গ্রে’স অ্যানাটমি’ নামের একটি বিখ্যাত মেডিকেল টিভি নাটক তাঁকে এমন ঘটনা থেকে শিক্ষা দিয়েছিল যে, ‘যেসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার কথা আপনি কখনো ভাবতেও পারবেন না, তেমন পরিস্থিতিতে কী করতে হয়।’

শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলার সময় আহমেদ বিষয়টি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, সোমবারের সেই মুহূর্তে যখন তিনি হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তখন কুরআনের সেই বাণীটি তাঁর মনে জেগে ওঠে যেখানে বলা হয়েছে—‘যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ এটি পবিত্র কুরআনের সূরা আল–মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতের অংশ।

তা ছাড়া তিনি উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে চালানো ব্যাপক গণ-বিতাড়ন বা ডিপোর্টেশন অভিযানের কারণে সেন্ট পলে দোকান চালানো তাঁর পূর্ব আফ্রিকার দেশ ইরিত্রিয়া থেকে আসা অভিবাসী পিতা-মাতার জন্য কতটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী আহমেদ আরও জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অপারেশন মেট্রো’ নামের অভিযানের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় অভিবাসন এজেন্টরা সেন্ট পল ও পাশ্ববর্তী মিনিয়াপোলিসে অভিযান চালানো শুরু করার পর থেকেই তাঁদের দোকানের বিক্রি কমে যায়।

আহমেদ বলেন, ‘পূর্ব আফ্রিকান একটি ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে সময়টা খুবই কঠিন ছিল…’ তবে আহমেদ স্বস্তি প্রকাশ করে জানান, এই সুযোগের মাধ্যমে তিনি ইরিত্রিয়ানদের এবং পূর্ব আফ্রিকানদের একটি ‘সুন্দর ও ইতিবাচক আলোয়’ তুলে ধরতে ও প্রতিনিধিত্ব করতে পেরেছেন।

তিনি উল্লেখ করেন যে, বাসের এই বীরত্বপূর্ণ কাজের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ একটি স্থানীয় মার্কেটিং ও মিডিয়া কোম্পানি তাঁকে ১ হাজার ডলার পুরস্কার দেয়। আহমেদ জানান, তাঁকে অন্তত একটি প্যানেল আলোচনায় কথা বলার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং সিটি কাউন্সিলের এক সদস্য তাঁকে অভিনন্দন জানাতে যোগাযোগ করেছেন। ইউরোপে থাকা তাঁর এক চাচাও খবর দেখে আহমেদকে ফোন করেছিলেন।

তবে আহমেদের কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো, তাঁর গল্পটি ইরিত্রিয়ানদের বিভিন্ন সামাজিক ও যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া ফেলেছে। আহমেদ আবেগভরে মন্তব্য করেন, ‘নিজের মানুষকে ইতিবাচকভাবে সবার সামনে তুলে ধরতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত।’


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা