November 5, 2026, 2:40 pm

ভারতের অর্থনীতিতে আস্থার সংকট

Reporter Name

গত সপ্তাহের স্বল্পমেয়াদি উত্থান বিনিয়োগকারীদের মনে আশার আলো জ্বালিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভারতের মুম্বাইয়ের দালাল স্ট্রিটে নেমে এসেছে তীব্র মন্দা। আজ সোমবার লেনদেন চলাকালেই ভারতীয় শেয়ার বাজারের বিনিয়োগকারীরা প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি হারিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের শেয়ারের বড় পতন, লাগাতার বিদেশি মূলধন প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের আকাশচুম্বী দামই মূলত এর প্রধান কারণ।

স্থানীয় সময় বেলা ২টা ৩০ মিনিটে দিনের লেনদেন শেষ হওয়ার আগে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক (বিএসই সেনসেক্স) এক ধাক্কায় ১০০০ পয়েন্ট নেমে যায়। অন্যদিকে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক (এনএসই নিফটি ৫০) ২৯৫ পয়েন্ট খুইয়ে ফেলে। এর ফলে টানা দুই দিন ধরে বজায় থাকা ঊর্ধ্বমুখী ধারা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই ধাক্কা শুধু বড় মূলধনের শেয়ারেই সীমাবদ্ধ ছিল না, নিফটি মিডক্যাপ ১০০ এবং নিফটি স্মলক্যাপ ১০০ সূচকেও বড় পতন রেকর্ড করা হয়েছে।

গত শুক্রবার বাজার বন্ধের সময় বিএসইভুক্ত সমস্ত কোম্পানির মোট বাজারমূল্য ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ ৬২ হাজার ১৬৭ কোটি রুপি। আজ সোমবার বেলা আড়াইটা নাগাদ তা একলাফে কমে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৬৮ লাখ ১৭ হাজার ৯৯৫ কোটি রুপিতে। ফলে চোখের পলকে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে প্রায় ৪ লাখ কোটি রুপি।

যেসব কারণে বাজারে ধস
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পতনের পেছনে তিনটি মূল কারণ সক্রিয় ছিল:

১. ব্যাংকিং খাতের বিপুল ধস

সম্প্রতি প্রকাশিত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে সন্তুষ্ট হতে পারেননি বিনিয়োগকারীরা। ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শেয়ার থেকে ব্যাপক অর্থ তুলে নেওয়া হয়। এইচডিএফসি ব্যাংক, আইসিআইসিআই ব্যাংক এবং অ্যাক্সিস ব্যাংক—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান মিলেই সেনসেক্সের মোট পতনের অর্ধেকেরও বেশি অবদান রেখেছে। কেবল এইচডিএফসি ব্যাংকের শেয়ারের দামই ৩ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না করায় অ্যাক্সিস ব্যাংকের শেয়ার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।

২. আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানিসংকট

ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ থেকে ১০৯ ডলারে উঠে যাওয়া বাজারে চরম উদ্বেগ বাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজে হামলার খবর ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যোগ হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারতের মতো আমদানিনির্ভর দেশের ক্ষেত্রে চড়া মূল্যের তেলের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দিচ্ছে।

৩. সাবেক ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পিছু হটা

ভারত থেকে মূলধন প্রত্যাহারের ধারা আরও তীব্র হয়েছে। চলতি অক্টোবর মাসেই এ পর্যন্ত বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীরা (এফপিআই) ভারতীয় শেয়ার বাজার থেকে প্রায় ৫২ হাজার ১০০ কোটি রুপি তুলে নিয়েছেন, যা চলতি বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসেও প্রায় ৩৫ হাজার ৮৬১ কোটি রুপি তুলে নিয়েছিলেন তারা।

জ্যেষ্ঠ অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অভিনব ত্রিপাঠীর মতে, ‘আগামী দিনগুলোতে বাজারের গতিপ্রকৃতি কেমন হবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের গতিপথ, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহের ওপর।’ তেলের উচ্চমূল্য বজায় থাকলে ভারতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে না, যার ফলে ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো শেয়ার বাজারের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


ফেসবুকে আমরা